Posts Tagged ‘কীয়ের্কেগার্দ’

কীর্কেগার্ড, একটি বৃহদাকার বিড়াল ও আমি – দুই

                                                                        দ্বিতীয় অধ্যায়

বিড়াল ও আমি হাটতে হাটতে বাসা থেকে বেশ খানিকটা দূরে এসে গেছি। আজকে রাস্তায় একজনও মানুষ দেখা যাচ্ছে না। কোন যানবাহনও নেই। শুধু আমরা দুটি প্রানী হাটছি। ঘুম থেকে উঠে আসার ফলে আমার ঘুম ঘুম ভাবটা রয়ে গিয়েছিল। আমি দেখতে পেলাম রাস্তার পাশে একটি পুরনো বট গাছের নিচে একটি চায়ের দোকান খোলা। চা পানের ইচ্ছে হল।

বিড়ালকে বললাম, “এই চায়ের দোকানে একটু চা খাওয়া যাক। তাহলে আমার ঘুম ঘুম ভাবটা দূর হবে।”

বিড়াল বলল, “চলুন তাহলে। তবে আমি চা খাই না। ক্যাফেইনে ঘুমের সমস্যা হয়।”

দোকানে পৌছে দেখলাম দোকানদার একমনে চা বানাচ্ছে। দোকানে কোন লোকজন নেই কিন্তু তবুও সে কেন চা বানাচ্ছে প্রশ্নটা মাথায় এসেছিল। কিন্তু তা আর জিজ্ঞেস করতে হল না। লোকটি হাসিমুখে আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, “আসুন আসুন। আমার দোকানের চা খান। মোতালেব মিয়ার দোকানের সত্যিকারের আসল চা।”

আমরা বেঞ্চিতে বসার পর সে চা এগিয়ে দিয়ে আবার নিরব হয়ে গেল। বিড়াল তখন বলল, “এই লোকটাকে দেখে আমার কীর্কেগার্ডের একটা ব্যাপার মনে পড়ল। তিনি কোপেনহেগেনের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে সাধারণ মানুষদের সাথে কথা বলতেন। তার মিশন ছিল গ্যাডফ্লাই অব কোপেনহেগেন হবার। সক্রেটিস নিজেকে যেমন বলতেন গ্যাডফ্লাই অব এথেন্স। কেন জানেন তো?”

আমি চা খেতে খেতে বললাম, “হ্যা, তিনি যে প্রশ্ন করে লোকদের বিব্রত করে তুলতেন তাই। গ্যাডফ্লাই হল ডাঁশপোকা, যা ঘোড়াকে বিব্রত করে।”

বিড়াল বলল, “ঠিক বলেছেন। যারা কিছু জানে বলে দাবী করে তাদের তিনি প্রশ্ন করতেন। তিনি কিন্তু কাউকে কোন শিক্ষা দেন নি। ফলে কোন টাকা পয়সাও নিতেন না। এখানে সোফিস্টদের সাথে তার পার্থক্য ছিল। সোফিস্টরা টাকার বিণিময়ে লোকদের শিক্ষা দিতেন। তারা ছিলেন পেশাদার একদল শিক্ষক। সক্রেটিসের ব্যাপারটা অপছন্দ ছিল। তরুণেরা সক্রেটিসের আশপাশে ভীড় করত কারণ তিনি যে নামী দামী ব্যক্তিদের প্রশ্ন করে এবং তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধির দ্বারা সেসব ব্যক্তির প্রদত্ত উত্তরের অসারতা প্রমাণ করে বিব্রত করে তুলতেন- এসব দেখে তারা মজা পেত।”

অবশ্য এজন্য সক্রেটিসের বিরুদ্ধে মামলা হলে বিচারকেরা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কেন এরকম লোকদের প্রশ্ন করে বিব্রত করেন?”

সক্রেটিস তখন বলেছিলেন তার এক বন্ধু চ্যায়রেফোন গিয়েছিল ডেলফির মন্দিরে। গিয়ে ওরাকলকে জিজ্ঞেস করল, “সক্রেটিসের চেয়ে বেশি জ্ঞাণী কেউ কি আছে?”

ওরাকলের উত্তর ছিল না বোধক। সক্রেটিস তা জেনে অবাক হলেন। কারণ তিনি কিছুই জানেন না মনে করতেন। তিনি বিষয়টা পরখ করতে নামলেন এথেন্সের রাস্তায়। বিভিন্ন লোকদের প্রশ্ন করলেন। প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে তিনি বুঝতে পারলেন লোকেরা জানে না যে তারা কিছু জানে না। তারা মনে করে অনেক কিছু জানে। এথেন্সের মধ্যে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি সে জানে সে কিছু জানে না। সুতরাং, সক্রেটিস ভাবলেন, ডেলফির মন্দিরে ঈশ্বর তাকে জ্ঞানী বলে ইঙ্গিতের মাধ্যমে বুঝিয়েছেন যে তিনি যেন এথেন্সের জ্ঞাণীদের বুঝিয়ে দেন তারা কিছু জানে না।

সুতরাং, তিনি নামলেন নতুন এক মিশনে। এথেন্সের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে যাদের এথেন্সবাসী জ্ঞাণী বলে জানে তাদের প্রশ্ন করতে শুরু করলেন। সক্রেটিস মনে করতেন এই প্রশ্ন করে লোকদের দেখানো যে যারা নিজেরা জানে বলে দাবী করে তারা কিছু জানে না, এটা তাকে দেয়া ঈশ্বরের পবিত্র দায়িত্ব।

কীর্কেগার্ডকে বুঝতে হলে সক্রেটিসকে বুঝতে হবে। অথবা বুঝতে হবে তিনি সক্রেটিসকে কীভাবে বুঝেছিলেন। সেই স্কুল অব সিভিক ভার্চ্যু তে পড়ার সময়ে তিনি প্রথম সক্রেটিস সম্পর্কে জানতে পারেন। স্কুলে সহপাঠীদের নিজের সূক্ষ্ণ বুদ্ধির মাধ্যমে এমনভাবে উত্যক্ত করে তুলতেন যে প্রায় সময়ই তাদের হাতে উত্তম মধ্যম খেয়েছেন। যুক্তিতে হেরে গেলে নির্বোধেরা রেগে যায়। তখন তাদের হাত চলে।

সক্রেটিস সম্পর্কে জানার উপায় হল তার দুই ছাত্র প্লেটো এবং জেনোফ্যানের লেখা আর এরিস্টোফ্যানিসের সক্রেটিসকে নিয়ে লেখা ব্যঙ্গাত্মক নাটক “দ্য ক্লাউডস’’। প্লেটোর ডায়লগসে যে চিত্র দেখা যায়, সক্রেটিস এথেন্সের রাস্তায় হেটে মানুষকে প্রশ্ন করতেন, এমনভাবে প্রশ্ন করতেন যে তিনি এ ব্যাপারে কিছু জানেন না কিন্তু জানতে আগ্রহী। তারপর উত্তরদাতা যখন উত্তর দিতে শুরু করত তখন তিনি সে উত্তরের অসারতা যুক্তি দিয়ে দেখিয়ে দিতেন। নিজে কিছু “না জানার ভান” করে অন্যকে এমন কোন উত্তরদানে প্রলুব্ধ করা যে উত্তরকে পরে যুক্তি দিয়ে চ্যালেঞ্জ করা যায় – এই প্রক্রিয়াটাকে বলে সক্রেটিক আয়রনী।

সক্রেটিস নিজে থেকে কিন্তু কোন উত্তরে যেতেন না। অনেক ক্ষেত্রে তার অনেক প্রশ্নোত্তর সংলাপ কোন সমাধানে পৌছাতে পারে নি। বিব্রত হয়ে কোন উত্তর খোঁজে না পেয়ে উত্তরদাতা অনেক সময় চলে গেছে। এই যে উত্তর খোঁজে না পাওয়ার মত অবস্থায় তিনি তাদের পৌছে দিতেন একে বলে “এপোরিয়া”।

সেসব ক্ষেত্রেও তিনি তার নিজস্ব কোন মত দেন নি। অর্থাৎ তার কোন পজিটিভ ডক্ট্রিন ছিল না। তিনি ছিলেন একজন নেগেটিভ দার্শনিক। কীর্কেগার্ড এই ব্যাপারটাতেই আকৃষ্ট হন। কীর্কেগার্ডের মাস্টার্স থিসিসের নাম ছিল কনসেপ্ট অব আয়রনী উইথ কন্টিনিউয়াল রেফারেন্স টু সক্রেটিস। এই নেগেটিভ থাকার জন্য অর্থাৎ নিজে থেকে কোন উত্তর না দেয়ার জন্যই কীর্কেগার্ড সক্রেটিসকে মহান মনে করতেন। এবং ঠিক এই কারণেই আরেক বড় দার্শনিক হেগেল সক্রেটিসের সমালোচনা করেছিলেন।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “সক্রেটিসের ডাইমন এবং মাইয়োটিকস এর ব্যাপারে কিছু বলুন?”

বিড়াল বলল, “সক্রেটিসের এ দুটি ব্যাপারটা বেশ কৌতুহলউদ্দীপক। সক্রেটিস বলতেন এক অদৃশ্য আত্মা বা স্পিরিট তাকে বিভিন্ন সময় পরিচালিত করে। সেই আত্মা তাকে কোন কিছু করতে বলেনা কিন্তু কিছু করতে নিষেধ করে। অর্থাৎ এর প্রকৃতি ছিল নেগেটিভ। সক্রেটিসের এই বিশ্বাস ছিল। একে বলে সক্রেটিসের ডাইমন। সক্রেটিস ভাবতেন যে পবিত্র দায়িত্ব তিনি ঈশ্বরের নির্দেশে করে যাচ্ছেন এই ডাইমনের নির্দেশনা তার অংশ। একইভাবে কীর্কেগার্ডও মনে করতেন তার পুরো জীবন এবং তার সমস্ত কাজ ঈশ্বরের দ্বারা পরিচালিত হয়েছে।”

“সক্রেটিসের মা ছিলেন ধাত্রী। সক্রেটিস তার প্রশ্ন করে যাওয়ার কাজটাকেও মনে করতেন ধাত্রীর কাজের মত। তিনি মানুষকে প্রশ্ন করে তার ভিতর থেকে সত্য বের করে আনতেন, এমন কিছু বিষয় বা জ্ঞাণ যা উত্তরদাতা নিজেও জানত না যে সে জানত। এগুলো তার ভেতরে ছিল। এই নিজে থেকে কোন জ্ঞাণ প্রদান না করে শুধুমাত্র প্রশ্ন করে অন্যের ভিতরের লুক্কায়িত জ্ঞাণ বের করে আনার প্রক্রিয়াকেই বলে সক্রেটিসের মায়োটিকস। কীর্কেগার্ড খ্রিস্ট ধর্ম নিয়ে লেখার ক্ষেত্রে এই মায়োটিকস দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন।”

কথা বলতে বলতে বিড়াল একবার হাই তুলল। হাই তুলার সময় সে তার ডান দিকের পা টা মুখের কাছে ধরেছিল।

আমি দেখলা চা ওয়ালা স্থির হয়ে বসে আছে। তাকিয়ে আছে নিচে চায়ের কেটলীর দিকে। সে কোন কথা বলছে না। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে কোন রোবট যে নির্দেশের অপেক্ষায় আছে।

আমি চাওয়ালার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি দেখে বিড়াল বলল, “লোকটিকে যতটুকু বলার জন্য এবং করার জন্য প্রোগ্রাম করা হয়েছিল ততটুকুই সে বলেছে এবং করেছে। তাই সে এমনভাবে বসে আছে। নিশ্চুপ হয়ে।”

আমি রাস্তার দিকে তাকালাম। সমস্ত এলাকা জনমানবহীন। রাস্তার পাশের ল্যাম্পপোস্টগুলোর আলোর কারণে অন্ধকার পুরোপুরি ঝেঁকে বসতে পারে নি। আবছা আলো বিদ্যমান।