Posts Tagged ‘কীয়ের্কেগার্দ’

কীর্কেগার্ড, একটি বৃহদাকার বিড়াল ও আমি – তিন

 

অধ্যায় তিন

বিড়াল ও আমি চায়ের দোকান থেকে রাস্তায় উঠে এলাম। চা খেয়ে ঘুমঘুম ভাবটা চলে গিয়েছিল। আমরা খুব ধীরে ধীরে হাটছিলাম। হালকা একটা বাতাসও বইছিল মাঝে মাঝে।

আমি একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম শত শত তারা সেখানে ঝুলে আছে। এই তারাগুলো কতো দূরে আমাদের থেকে। সূর্যের চেয়ে বড় একেকটা নক্ষত্রকে কতো ক্ষুদ্র দেখায়!

আমি বিড়ালকে জিজ্ঞেস করলাম, “কীর্কেগার্ড সক্রেটিস সম্পর্কে পড়েছিলেন তো প্লেটো, জেনোফ্যান এবং এরিস্টোফ্যানিসের লেখার মাধ্যমে?”

বিড়াল বলল, “হ্যা, ওগুলোই মূল উৎস। এছাড়া বিখ্যাত জার্মান দার্শনিক হেগেলের সক্রেটিস নিয়ে বিভিন্ন অনুমান ছিল। কীর্কেগার্ড সেগুলো থেকেও সক্রেটিস সম্পর্কে ধারণা পেয়েছেন এবং তার নিজের চিন্তা দাড় করিয়েছেন। কীর্কেগার্ড যখন ছাত্র ছিলেন, তখন কোপেনহেগেন ইউনিভার্সিটিতে ছিল হেগেলের জয়জয়কার। এ নিয়ে কথা বলতে হলে একটু মার্টেনসেন সম্পর্কে বলতে হবে। শুনতে আপনার আপত্তি আছে কি?”

আমি বললাম, “আপত্তি থাকবে কেন! মার্টেনসেন কে ছিলেন?”

বিড়াল বলল, “হ্যান্স ল্যাসেন মার্টেনসেন ছিলেন একজন ডেনিশ একাডেমিশিয়ান। পরে বিশপ হন। কীর্কেগার্ড এর থেকে বছর পাঁচেকের বড় ছিলেন। তিনি ভিয়েনা, মিউনিখ, বার্লিন, হাইডেলবার্গ, প্যারিস ইত্যাদি শহর ভ্রমণ করে তৎকালীন হেগেল বিষয়ক বড় বড় দার্শনিক ও চিন্তকদের সাথে দেখা স্বাক্ষাত করেন এবং কোপেনহেগেনে ফিরেন ১৮৩৬ সালে। ১৮৩৭ সালে কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি তার থিসিস ডিফেন্স করে। তার থিসিসের বিষয় ছিল – অন দ্য অটোনমি অব হিউম্যান সাবকনশাসনেস। কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে হেগেলের জনপ্রিয়তার পিছনে ছিলেন মার্টেনসেন। তার থিসিস রাতারাতি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিখ্যাত হয়ে উঠে। সে বছরই তিনি কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচার দেয়া শুরু করেন। সব বিভাগের ছাত্ররা এসে ভীড় জমাত তার লেকচার শোনার জন্য। তিনি জার্মান শহরগুলোতে তার ভ্রমণের সময় জানতে পারা দর্শন এবং ধর্মতত্ত্বের নতুন চিন্তা সম্পর্কে বলতেন। তখন আসলে মার্টেনসেন হয়ে গিয়েছিলেন একজন একাডেমিক সেলিব্রেটির মতো।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কীর্কেগার্ড কি সেই লেকচারগুলো শুনতে যেতেন?”

বিড়াল বলল, “মার্টেনসেন কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে যেন নতুন প্রাণ ফিরিয়ে এনেছিলেন। তিনি এমনভাবে দর্শন ও ধর্মতত্ত্বের কথাগুলো বলতেন যা আগে কেউ বলে নি। ফলে ছাত্ররা তাতে দারুণভাবে আকৃষ্ট হয়েছিল। কীর্কেগার্ডও তার লেকচার শুনতে এসেছিলেন। কিন্তু তার ভালো লাগে নি। তিনি দেখলেন সবাই মার্টেনসেনের লেকচার এতো আগ্রহ নিয়ে শুনছে কিন্তু তার ভালো লাগছে না, এই অবস্থায় তিনি একাকীত্ব বা এলিয়েনেটেড অনুভব করেন। হলভর্তি ছাত্রদের উপর তিনি হতাশ হয়ে পড়েন। কিন্তু সক্রেটিসের ব্যাপারে হেগেলের চিন্তাগুলো জানার জন্য হেগেল পড়তে থাকেন মনযোগ দিয়ে।”

আমি হাটতে হাটতে জিজ্ঞেস করলাম, “তা সক্রেটিস নিয়ে হেগেলের ভাবনা কেমন ছিল?”

বিড়াল বলল, “হেগেল এর মৃত্যু হয় ১৮৩১ সালে। তিনি বর্তমান ইউনিভার্সিটি অব বার্লিনে পড়াতেন। তার মৃত্যুর পর তার লেকচারগুলো এবং প্রকাশিত সব কাজ একসাথে সিরিজ আকারে প্রকাশ করেন তার ছাত্ররা। দর্শনের জগতে এক গুরুত্বপূর্ন কাজ। কীর্কেগার্ড হেগেলের লেকচারগুলোর সব ক’টি সংগ্রহ করেন। দর্শনের ইতিহাস অংশে হেগেল সক্রেটিস নিয়ে আলোচনা করেছেন। তার মতে সক্রেটিসের পূর্বের দার্শনিকেরা ছিলেন এক ধরনের প্রকৃতি বিজ্ঞানী। তারা প্রাকৃতিক ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়ে জগৎ বুঝতে চাইতেন ঈশ্বর বা স্বর্গীয় কিছুর সাহায্য ব্যতিরেকে। তারা তাদের বাইরের পৃথিবীটাকে গুরুত্ব দেন। কিন্তু সক্রেটিস প্রথমে তার চিন্তার কেন্দ্রে মানুষকে আনেন। তিনি প্রকৃতির চাইতে মানুষ কীভাবে চিন্তা করে, কীভাবে বুঝে এর উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি মনে করতেন প্রকৃতি বুঝার আগে মানুষ কীভাবে চিন্তা করে তা বুঝা জরুরী। গ্রীক দর্শন এমনকী সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও এই ধারণা ছিল বৈপ্লবিক। গ্রীকেরা তখন বিভিন্ন স্বর্গীয় বা ঈশ্বর প্রদত্ত বিধি বিধান, প্রথা মেনে চলত। যাকে হেগেল বলেন জিটিকেট। এর অর্থ দাঁড়ায় এথিক্যাল লাইফ/নৈতিক জীবনযাপন। এক্ষেত্রে নৈতিক বিধিবিধান কেবল ঐশ্বরিক বলেই সত্য নয়, তারা মনে করত এগুলো প্রকৃতিগত ভাবেও সত্য। ন্যাচারাল ল বা প্রকৃতিগত নিয়ম বলে একটা কথা আছে, কোন কিছু ঠিক বা বেঠিক প্রকৃতিগতভাবেই। এই বর্তমান প্রাকৃতিক নিয়মের চিন্তা সেই প্রাচীন গ্রীসেও ছিল। আপনি কি সফোক্লিসের এন্টোগোনি পড়েছেন?”

এন্টিগোনি আমার পড়া ছিল। বিড়ালের প্রশ্নের উত্তরে বললাম, “হ্যা পড়েছি। এর সাথে এন্টিগোনির কি কোন সম্পর্ক আছে?”

বিড়াল বলে, “সফোক্লিসের এন্টিগোনিতে এন্টিগোনির ভাই পলিনেসিস মারা যায়। রাজা ক্রেয়ণ বলেন তার লাশ কবরস্ত করা যাবে না। ফেলে রাখা হবে। যে এই লাশ কবরস্ত করতে চেষ্টা করবে তাকে শাস্তি পেতে হবে। এন্টিগোনি লাশ কবরস্ত করতে গেল। কারণ পলিনেসিস তার ভাই। রাজার আইন বা নিয়ম যাইহোক, তার ফ্যামিলির প্রতি দায়িত্ব বা পরিবারের প্রথা হচ্ছে আত্মীয়ের মৃতদেহ সৎকার করা। এখানে এন্টোগনি রাজার আইনের বিরুদ্ধে গেছে ঠিকই, কিন্তু নিজে চিন্তা করে কোন সিদ্ধান্তে যায় নি। রাজার আইনের প্রতি তার বিরোধীতা আরেক আইনের প্রতি তার আনুগত্য। প্রাচীন গ্রীসের অবস্থা তখন এরকম ছিল। কিন্তু সক্রেটিস প্রথম বললেন, একজন মানুষের সত্যে পৌছাতে হবে নিজের মধ্য দিয়ে। বাইরের আইন কানুন যাই হোক তাকে অগ্রাহ্য করে মানুষকে চিন্তার কেন্দ্রে নিয়ে আসার এই ব্যাপারটা যুগান্তকারী একটা বিষয়। এই চিন্তা তৎকালীন গ্রীক সংস্কৃতির পুরোপুরি বিরুদ্ধে। মূলত এই কারণেই সক্রেটিসকে তার প্রাণটা দিতে হয়েছিল।”

আমি বিড়ালকে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি কি বলছেন মানুষের ভেতরেই শুধু সত্যের অবস্থান, বাইরে নয়?”

বিড়াল বলল, “আমি হেগেলের কথা বলছি। সত্যের অবস্থান যে শুধু ভেতরে এমন নয় ব্যাপারটা। তবে সত্যে পৌছাতে হলে আপনার নিজের চিন্তার মাধ্যমে সেখানে পৌছাতে হবে। যেমন, এন্টিগোনি যদি পরিবারের প্রথা, ঐশ্বরিক নিয়ম এসব মানার জন্য ভাইয়ের মৃতদেহ সৎকারের চেষ্টা না করে নিজে চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিত। নিজে চিন্তা করে একই সিদ্ধান্ত নিলেও তাকে বলা যেত সে জিটিকেট এর মধ্যে নেই। তখন তাকে বলা যেত সক্রেটিস বা কীর্কেগার্ডের মত?”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কীরকম?”

বিড়াল বলল, “কীর্কেগার্ড তার প্রথম জার্নাল তথা ডায়রীতে লিখেছিলেন তিনি জীবনে কি করতে চান তা নিয়ে সন্দিহান। তিনি এমন একটি আইডিয়া খুজছেন যার জন্য বাঁচা যায়, জীবনও দিয়ে দেয়া যায়। তিনি বাইরের পৃথিবীকে (অবজেকটিব ওয়ার্ল্ড) অগ্রাহ্য করে তার নিজের ভেতর থেকে সেই দিক নির্দেশনা পেতে চান। সক্রেটিসও এমন করেছিলেন। সমাজ বা অন্য সব অথরিটি যেসব রীতি নীতি ঠিক করে দেয় তা অগ্রাহ্য করে তিনি নিজে চিন্তা করেছিলেন তার জন্য সত্য কি। বাইরের পৃথিবী (অবজেকটিভ ওয়ার্ল্ড) থেকে নিজের ভেতরের পৃথিবীতে (সাবজেকটিভ ওয়ার্ল্ডে) দৃষ্টি নিবদ্ধ করা।”

আমি হাটতে হাটতে বললাম, “আচ্ছা। আপনি আগে একবার বলেছিলেন সক্রেটিস কোন পজেটিভ উত্তরে যান নি বলে হেগেল তার সমালোচনা করেছেন। এ ব্যাপারে আরেকটু বলুন।”

বিড়াল বলল, “হেগেলের মতে ‘বিয়িং + নাথিং = বিকামিং।’ সক্রেটিস নিজে থেকে কোন উত্তর দিতেন না। তিনি প্রশ্ন করতেন। উত্তরদাতা উত্তর দিত। সক্রেটিস সেই উত্তরের উপর ভিত্তি করে বিষয়টাকে আরো জটিল করে তুলতেন বা যুক্তির আলোকে এর অসাড়তা দেখিয়ে দিতেন। তখন লোকটি আরেক উত্তরে যেত। সক্রেটিস সেই উত্তরের ক্ষেত্রেও একই কাজ করতেন। এভাবে করতে করতে একসময় উত্তরদাতা হতাশ হয়ে চলে যেত। সক্রেটিস নিজে যেহেতু কোন উত্তর দেন নি ফলে এগুলো কোন মীমাংসায় যেত না। হেগেলের মতে সক্রেটিস নাথিং এ আটকে থেকেছেন। তার পরের স্তরে যান নি। ফলে যে দ্বন্দ্ব বা সমস্যার উদ্ভব তার কোন সমাধান হয় নি। সক্রেটিসে গুরুত্ব হলো “ভালো” নিয়ে তার চিন্তা। মানুষের জন্য কি “ভালো” তা সমাজ বা ঐশ্বরিক কোন রীতি দ্বারা নির্ধারিত হবে এর বিরুদ্ধে গিয়ে সক্রেটিস বলেছেন মানুষের ভালো সে নিজের মাধ্যমে বুঝবে।”

আমি বললাম, “তার মানে সবার উপরে মানুষ সত্য?”

বিড়াল বলল, “কথাটা আপেক্ষিকতাবাদী সোফিস্টদের মতো হয়ে গেল। সক্রেটিস আপেক্ষিকতাবাদী ছিলেন না। সোফিস্টদের মতো তিনি মনে করতেন না মানুষই সব কিছুর পরিমাপ। তার মতে ইউনিভার্সাল সত্য আছে এবং সেটা মানুষ নিজের মাধ্যমে বুঝবে। সমাজ বা কোন রীতি তাকে কোনটা সত্য, কোনটা মিথ্যা তা বলে দেবে না।”

একটা বড় বটগাছের কাছকাছি আমরা চলে এসেছিলাম। গাছের বয়স হবে কয়েকশ বছর। এরকম বড় নগরের গাছদের বৃদ্ধ পিতার মতো মনে হয়।

বিড়াল হঠাৎ থামল। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “এক মিনিট দাড়ান।”

আমি কিছু বুঝতে না পেরে দাঁড়িয়ে রইলাম। বৃহদাকার বিড়াল তার লেজ নাড়াতে নাড়াতে বটগাছের আড়ালে গেল। কয়েক মুহুর্ত পর আবার ফিরে আসতে লাগল। আমি দেখলাম তার মুখে সিগারেট জ্বলছে।

অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি সিগারেট খান নি?”

বিড়াল ধোঁয়া ছেড়ে আমাকে পালটা প্রশ্ন করে বসল, “আপনি কোরিয়ান লোকগল্প পড়েন নি?”

আমি বললাম, “না, পড়া হয় নি। কেন বলুন তো?”

বিড়াল বলল, “লোকগল্প পড়বেন। ওতে বুঝার মতো অনেক কিছু থাকে। অন্য জায়গার লোককথার গল্প শুরু “একদা একদেশে ছিল এক” এরকম বাক্য দিয়ে। কোরিয়ান অনেক লোকগল্প শুরু হয় এরকম “ একদা যখন বাঘেরা ধূমপান করতো” দিয়ে। আর বাঘেরা বলতে তো আমরাও, একই গোত্রেরই। ফলে আমার ধূমপানে অত অবাক হবার কিছু নেই।”

বিড়াল এই কথা বলে আয়েশী ভঙ্গিতে হাটতে হাটতে ধোঁয়া ছাড়ল। তার ধোঁয়া ছাড়ার ভঙ্গি দেখে আমার মনে হলো সে কীর্কেগার্ড নিয়ে আরো কিছু বলবে একটু পর এবং ভেতরে ভেতরে কথা গুছিয়ে আনছে। মনে একটা উদ্ভট প্রশ্ন চলে আসলো আমার, ধূমপান কথা গুছানোতে সাহায্য করে কি?