Archive for the ‘প্রথম অধ্যায়’ Category

কীর্কেগার্ড, একটি বৃহদাকার বিড়াল ও আমি

                                                                 প্রথম অধ্যায়

মধ্যরাতে ঘুম ভেঙ্গে গেল। দরজায় কেউ নক করছে। উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেখি বড় সাইজের এক বিড়াল দাঁড়িয়ে। তার মুখ গম্ভীর, চোখদুটি অন্ধকারে রেডিয়ামের মত জ্বলছে। তার উচ্চতা সাড়ে পাঁচ ফুটের মত।

আমাকে দেখে বলল, “খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। তাই আপনার সাথে দেখা করতে এলাম। বিরক্ত হবেন না।”

আমি ইতস্তত করে বললাম, “বিরক্ত হচ্ছি না। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটা কি?”

বিড়াল বলল, “সোরেন কীর্কেগার্ড আপনার সাথে দেখা করতে চেয়েছেন। তিনি জানতে পেরেছেন আপনি তার জীবন ও কাজের ব্যাপারে আগ্রহী। তাই আমাকে পাঠিয়েছেন তার কাছে আপনাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আপনি কি যেতে চান?”

আমি বেশ অবাক হলাম। বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল যে বিড়ালটা সত্যিই কীর্কেগার্ডের কাছ থেকে এসেছে। খানিকক্ষণ চিন্তা করে বললাম, “অবশ্যই যেতে চাই। কখন যেতে হবে?”

বিড়াল বলল, “আজ, এখনই।”

আমি বললাম, “কিন্তু আমার তো তৈরী হতে হবে। ঘুমিয়ে ছিলাম। এই টি শার্ট আর ফোর কোয়ার্টার প্যান্ট পড়ে যাওয়া কি ঠিক হবে?”

বিড়াল বলল, “এতে কোন সমস্যা নেই। দেখা আজ রাতেই করতে হবে। সময় খুব একটা নেই। ভোরের আলো ফুটলেই সময় শেষ। তাছাড়া পোশাকে কিছু যায় আসে না।”

বিড়ালের কথা যুক্তিযুক্ত মনে হল। আমি টি শার্টের উপর একটা শার্ট নিয়ে ঘর থেকে বের হলাম। গভীর অন্ধকার নির্জন রাত। আমি ও বৃহদাকার বিড়াল পাশাপাশি চলেছি। আমি তখন দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছিলাম যে বিড়ালকে তুমি না আপনি করে সম্বোধন করব। এটা যদি সাধারণ ছোট সাইজের কোন বিড়াল হত তাহলে এ ভাবনার উদয় হত না নিশ্চয়ই। অনায়াসেই তাকে তুমি করে বলা যেত। কিন্তু এই বিড়ালের যা আকার, একটা ছোটখাট বাঘের মত। একে তো আর তুমি করে বলা যায় না।

আমি বিড়ালটাকে জিজ্ঞেস করলাম, “কিন্তু আপনি কে?”

বিড়াল চলতে চলতে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমিও আপনার মত। কীর্কেগার্ড নিয়ে আমার আগ্রহ ছিল। আজ থেকে প্রায় সাতবছর আগে এক মধ্যরাতে কীর্কেগার্ডের এক দূত এসে আমাকে তার কাছে নিয়ে যায়।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তারপর?”

বিড়াল বলল, “তারপর কী হয়েছিল তা এখন আর না বলি। আপনি যাচ্ছেন, নিজেই দেখতে পাবেন। আর আমাকে আপনি কীর্কেগার্ড সম্পর্কে যে কোন প্রশ্ন করতে পারেন। আমি যতটুকু জানি তা দিয়ে প্রশ্নের উত্তর দেব। উনার কাছে যাচ্ছেন, তার সম্পর্কে কিছু জেনে যাওয়া ভালো। নাহলে আপনি তার সম্পর্কে কতটুকু জানেন তা যাচাই করতে উনি যদি জিজ্ঞেস করেন কিছু আর আপনি যদি বলতে না পারেন তাহলে লজ্জ্বায় পড়তে হতে পারে। আমার ক্ষেত্রেও এরকম কিছু হয়েছিল। তবে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি বেশি গভীর কিছু আমি হয়ত বলতে পারব না। হয়ত বলতে পারব না পুরোপুরি সঠিকভাবে তার দর্শন সম্পর্কে। তবে এমন কিছু অবশ্যই বলতে পারব যাতে কীর্কেগার্ড এর ব্যাপারে আপনার আগ্রহ আরো বেড়ে যায়।”

আমি বললাম, “সেই ভালো। অতিরিক্ত কঠিন বা একাডেমিক কথাবার্তা আমার ভালো লাগে না। ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকদের লেকচার ইজিয়াম, মাইলাম, ডরমিকাম এর চাইতেও ভালো ঘুমের ওষুধ।”

বিড়াল হাসল কি না বুঝা গেল না। সে হাটতে হাটতেই বলল, “তাহলে একটু আলোচনা শুরু করা যাক। কথা না বলে হাটা আমার জন্য বিরক্তিকর। সোরেন কীর্কেগার্ডের পুরো নাম Søren Aabye Kierkegaard, তার জন্ম ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে ৫ মে ১৮১৩ সালে। ১৮১৩ সালে আপনাদের ভারতীয় উপমহাদেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছিল। বলুন তো কি?

আমি বললাম, “ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এক্ট ১৮১৩ এর কথা বলছেন?”

বিড়াল বলল, “হ্যা, এই চার্টার এক্ট এর মাধ্যমে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ১৬০০ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে রানী এলিজাবেথ যে চার্টার দিয়েছিলেন তা আরো বিশ বছরের জন্য নবায়ন করে। অবশ্য ১৭৯৩ সালে আরেকবার নবায়ন হয়েছিল। যাইহোক, এটা আমাদের বিষয় না। বললাম এ কারণে যে তাহলে ঐ ১৮১৩ সালটা ঠিক কোনসময় তা বুঝতে সুবিধা হয়। পরিচিত জিনিসের সাথে সম্পর্কিত করতে পারলে মনে রাখার ক্ষেত্রেও সুবিধা। যেমন, আমি যদি বলি কীর্কেগার্ডের জন্ম ১৮১৩ সালে তখন আপনি একটা সংখ্যা জানলেন। কিন্তু আমি যদি বলি কীর্কেগার্ডের জন্ম ১৮১৩ সালে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম ১৮১৭ সালে, বাঙালী রেনেসার প্রবাদ পুরুষ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্ম ১৮২০ সালে, তখন সামান্য হলেও সালটা নিয়ে ধারনা পাওয়া যায়। সেই সময়কালের কলকাতার অবস্থা নিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘সেই সময়’ যদি আপনার পড়া থাকে তাহলে সময়টা বুঝতে সুবিধা হবে। তবে অবশ্যই এই সময়ে ইউরোপের চিত্র ভিন্ন ছিল।”

জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও পড়েছেন নাকি?”

বিড়াল কিছুটা লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল, “তা একটু আধটু তো পড়তেই হয়। তাছাড়া আপনার সাথে দেখা করতে আসার আগে কিছু হোমওয়ার্ক করতে হয়েছে। এখন আপনি বলেন কীর্কেগার্ড সম্পর্কে কী জানেন?”

আমি বললাম, “হ্যা। কীর্কেগার্ডকে অস্তিত্ববাদের জনক বলা হয়। অনেকে আবার বলেন আধুনিক অস্তিত্ববাদের জনক। তিনি কিন্তু জ্যাঁ পল সার্ত্রের প্রায় শতাব্দীকাল আগেই এসব লিখে গেছেন। তবে আমরা শুরুতেই ওসব কথায় না গিয়ে বরং হালকা বিষয় নিয়ে কথা বলি। কীর্কেগার্ডের সাথে রেজিনা ওসলেনের সম্পর্কটা নিয়ে কিছু বলুন। এ নিয়ে আমার আগ্রহ প্রচুর।”

kierkegaard vs regine

বিড়াল হাসিমুখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “ভালো একটা ব্যাপার মনে করেছেন। এটা কীর্কেগার্ডের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এবং মনে করা হয় তার কাজে রেজিনা ওলসেনের গভীর প্রভাব ছিল। ওই যে কথায় আছে না, প্রতিটা সফল মানুষের পিছনে রয়েছেন একজন রমনী। বীটলসের জন লেনন আবার বলে গেছেন, এজ ইউজুয়াল দেয়ার ইজ এ গ্রেট ওমেন বিহাইন্ড এভ্রি ইডিয়ট। কীর্কেগার্ড আর রেজিনা ওলসেনের সম্পর্কটা নিয়ে খুব দারুণ গল্প লেখা যাবে। কীর্কেগার্ড তখন কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তিনি তার বিখ্যাত মাস্টারস এর থিসিস কনসেপ্ট অব আয়রনী লিখছেন। কোপেনহেগেনের এক শহরতলীতে ১৮৩৭ সালের এক শরৎকালে কীর্কেগার্ড প্রথম পনের বছরের রেজিনা ওসলেনকে দেখেছিলেন। রেজিনা দেখতে সুন্দরী ছিলেন। কীর্কেগার্ডের ভালো লেগে যায়। তারপর তাদের মোটামোটি চেনা জানা সম্পর্ক ছিল প্রায় তিন বছর। ১৮৪০ এর আগস্ট সেপ্টেম্বরের দিকে কীর্কেগার্ড তার থিসিস শেষ করলেন। ১৮৪০ সালের ৮ সেপ্টেম্বর এক দুপুরে কীর্কেগার্ড দেখলেন রেজিনা তার বাড়িতে যাচ্ছেন হেটে। কীর্কেগার্ড তার সঙ্গ নিলেন। বাড়িতে পৌছার পর দেখা গেল বাড়ির অন্যসব সদস্যরা তখন বাইরে। কীর্কেগার্ড এর সাথে রেজিনার সম্পর্ক বন্ধুর মত ছিল। রেজিনা ভালো পিয়ানো বাজাতে জানতেন। কীর্কেগার্ড তাকে অনুরোধ করলেন পিয়ানো বাজিয়ে শুনাতে। রেজিনা এর আগেও কীর্কেগার্ডকে পিয়ানো বাজিয়ে শুনিয়েছেন। তিনি বেশ সুন্দরভাবে পিয়ানো বাজাতে লাগলেন। কিন্তু কীর্কেগার্ড অস্থির হয়ে উঠলেন। তার মাথায় তো অন্যচিন্তা।

সামান্য সময় পর তিনি শব্দ করে গানের খাতাটি বন্ধ করে রেজিনার কাছে গিয়ে বললেন, “আমি তো এখানে পিয়ানো শুনতে আসি নি। আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।”

রেজিনা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। কারণ কীর্কেগার্ড এরকম প্রস্তাব করে বসবেন এবং তাও এভাবে তিনি কল্পনাও করেন নি। তিনি কোন উত্তর না দিয়েই দৌড়ে অন্য ঘরে চলে গেলেন।

কীর্কেগার্ডও দমে যাবার পাত্র নন। তিনি চলে গেলেন রেজিনার বাবার কাছে। রেজিনার বাবা তখন উচ্চপদস্ত সরকারী কর্মকর্তা।

রেজিনার বাবাকে গিয়ে কীর্কেগার্ড বললেন, “আমি আপনার মেয়েকে বিয়ে করতে চাই।”

রেজিনার বাবাও অবাক হলেন। বলাবাহুল্য, একই শহরে বসবাস তাই তিনি আগে থেকেই কীর্কেগার্ডকে চিনতেন। কিন্তু এরকম হঠাৎ করে প্রস্তাব তার কাছেও ছিল অপ্রত্যাশিত।

তিনি ইতস্তত করে বললেন, “আচ্ছা আমি আমার মেয়ের সাথে কথা বলে দেখি সে কী বলে।”

তারপর দুই দিন চলে গেল। দুইদিন পর রেজিনা তার সম্মতি জানালেন। রেজিনা এবং কীর্কেগার্ডের বাগদান সম্পন্ন হল।

কিন্তু এই বাগদানের পরেই কীর্কেগার্ডের মনে হতে লাগল বিয়ে করা তার জন্য ঠিক হবে না। তার বাবা মাইকেল পেডারসন কীর্কেগার্ডের ভেতরে এক ধরনের নিঃসঙ্গতা ও অপরাধবোধ ছিল। এই অপরাধবোধের উৎস বা কারণ, তার কীর্কেগার্ডের মা (যিনি প্রথমে তার বাড়িতে কাজ করতেন, পরে প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি তাকে বিয়ে করেন)-এর সাথে বিয়ের আগে তার শারিরীক সম্পর্ক ছিল। এছাড়া পেডারসন একসময় খুব গরীব কিশোর ছিলেন। তখন তিনি অধৈর্য ও হতাশ হয়ে ঈশ্বরের প্রতি অসম্মানসূচক কথাবার্তা বলেছিলেন। এই দুই কারণে প্রচন্ড অপরাধবোধে ভুগতেন।

এই নিঃসঙ্গতা বা অপরাধবোধ উত্তরাধীকার সূত্রে কীর্কেগার্ডের মধ্যে চলে এসেছে কীর্কেগার্ডের এমনি ধারণা ছিল। এছাড়া কীর্কেগার্ডের মা এবং পাঁচ ভাইবোন মারা গিয়েছিলেন তার ২১ বছর বয়স হওয়ার মধ্যে। কোন এক অদ্ভুত কারণে কীর্কেগার্ড মনে করতেন তিনি ৩৩ বছর বয়সে মারা যাবেন। এসব চিন্তা তাকে বিয়ে করতে বাঁধা দিল। এছাড়া বিয়ে নামক সম্পর্কের উপরে তখন তার বিশ্বাস টলে গিয়েছিল সম্ভবত।

১৮৪১ সালের আগস্টে তিনি সিদ্ধান্ত নেন বিয়ে করা যাবে না। এই সিদ্ধান্তের পেছনে কেবল যে তার নিঃসঙ্গতা বা পারিবারিক দুঃখের স্মৃতি, মৃত্যুভয় ইত্যাদি ছিল তা জোর দিয়ে বলা যায় না। তার এই হঠাৎ মত পরিবর্তনের কারণ ছিল অনেক। বিভিন্ন দিক থেকে গবেষকেরা একে ব্যাখ্যা করেছেন।

যাইহোক, ১১ ই আগস্ট তিনি রেজিনা ওসলেনকে আংটি ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, লিখে জানালেন তিনি তাকে বিয়ে করতে পারবেন না।

রেজিনা কীর্কেগার্ডের আকস্মিক এই চিঠি পড়ে তার বাসায় ছুটে আসলেন। কীর্কেগার্ড তখন বাসায় ছিলেন না। রেজিনা তাকে ছেড়ে না যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়ে একটি নোট লিখে চলে এলেন।

রেজিনা এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে না পেরে হুমকি দিলেন কীর্কেগার্ড সিদ্ধান্ত না বদলালে তিনি আত্মহত্যা করবেন। রেজিনার বাবা কীর্কেগার্ডকে তার বাড়িতে নিয়ে গিয়ে প্রায় হাতজোড় করে অনুরোধ করলেন। কারণ তখনকার সময়ে এরকম বাগদান ভেঙ্গে যাওয়া অভিজাত পরিবারদের জন্য ছিল খুব লজ্জ্বার। তিনি কীর্কেগার্ডকে তার সিদ্ধান্ত বদলানোর অনুরোধ করলেন এবং এরকম হঠাৎ করে বাগদান ভেঙ্গে দিলে তার মেয়ে কীভাবে ভেঙ্গে পড়বে তা বুঝালেন।

কিন্তু কীর্কেগার্ড তার সিদ্ধান্তে অনড় রইলেন।

তিনি রেজিনার সাথে শেষবারের মত দেখা করলেন। তিনি চেষ্টা করলেন বুঝাতে যে তিনি তাকে আর ভালোবাসেন না। রেজিনা তখন জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তুমি বিয়ে করবে না?”

কীর্কেগার্ড বলেছিলেন, “আরো দশ বছর পরে যখন বৃদ্ধ হবো তখন নবযৌবনের জন্য কোন যুবতীকে বিয়ে করব।”

কিন্তু তিনি জীবনে আর বিয়ে করেন নি।

রেজিনা যখন কীর্কেগার্ডকে ফেরানো যাবে না বুঝতে পেরে সব মেনে নিলেন।

কোপেনহেগেন তখন খুব ছোট শহর। সবাই সবাইকে চিনত। এই ঘটনা জানাজানি হতে সময় লাগল না। ওলসেন পরিবার সমস্ত শহরের সামনে অপমানিত অনুভব করতে লাগল।

কীর্কেগার্ডেরও ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হল। অক্টোবরের ২৫ তারিখ তিনি নৌকার করে তৎকালীন প্রুশিয়ার রাজধানীর জার্মানীর উদ্দেশ্যে রওনা হলেন।”

বিড়াল এবং আমি কথা বলতে বলতে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। কীর্কেগার্ডের অদ্ভুত এই প্রেমকাহিনী শুনে বেশ বিরক্তই লাগল। এরকম করে কেউ? রেজিনা ওসলেনের জন্য মমতাই হল।

আমি বিড়ালকে বললাম, “কীর্কেগার্ড এই কাজটা কিন্তু ঠিক করেন নি।”

বিড়াল তখন ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে শান্তস্বরে বলল, “কারো ব্যক্তিগত জীবন কি এভাবে বিচার করা ঠিক? রেজিনা সমস্ত ব্যাপারটা মেনে নিয়েছিলেন। পরে তিনি জোহান ফ্রেডরিক শ্লেগেলকে (যিনি তার প্রাইভেট টিউটর ছিলেন) বিয়ে করেছিলেন। আর কীর্কেগার্ড তার এই ভেঙ্গে দেয়া বা ভেঙ্গে যাওয়া সম্পর্ক কখনো ভুলে যেতে পারেন নি। তার সমগ্র জীবনে অদৃশ্য ছায়ার মত ছিল এই ঘটনার প্রভাব। কীর্কেগার্ডের জীবনে রেজিনা ওসলেনের যে প্রভাব, অন্য কোন দার্শনিকের বিকাশে এরকম কোন মহিলার প্রভাব ছিল কি না আমি জানিনা। তবে এই সম্পর্কটার কারণেই পুরো পশ্চিমা দর্শন জগতে রেজিনা ওলসেন অনন্য এক আসন পেয়ে গেছেন। কীর্কেগার্ড তার জার্নালে লিখেছিলেন রেজিনাহীন রাত্রী তিনি কান্নায় পার করেছেন। তিনি যে রেজিনা ওলসেন কে সত্যি সত্যি ভালোবাসতেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। শেষে তিনি রেজিনার কাছে ক্ষমাও চেয়েছিলেন। এর একটি লাইন ছিল এরকম –

“”Above all, forget the one who writes this; forgive someone who, whatever else, could not make a girl happy.””

আমি বিড়ালের দিকে তাকিয়ে বললাম, “আসলেই অদ্ভুত ব্যাপার।”

বিড়াল তার লেজ নাড়িয়ে বলল, “তা বলা যায়। কীর্কেগার্ড নিয়ে কথা বলতে বলতে আমরা আরো কিছু জানবো নিশ্চয়ই এ ব্যাপারে এবং তার জীবন কিংবা কাজে এর প্রভাবের ব্যাপারে। কিন্তু আমি তার জার্নালগুলো থেকে কোন উদ্ধৃতি টুদ্ধৃতি দিতে পারবো না কিন্তু। আমার ওসব মনে থাকে না। আর এটা যেহেতু আমাদের একান্তই সাধারণ আলোচনা তাই একাডেমিকভাবে তার কাজ সম্পর্কে বিশ্লেষন বা উল্লেখেও যাবো না আমি। সহজভাবে আপনাকে ততটুকুই বলব যা আপনার জানা প্রয়োজন কীর্কেগার্ডের সামনে যেতে হলে।”

আমি বললাম, “বেশ। তাই হোক। কথা বলতে আমার ভালোই লাগছে। এখন কীর্কেগার্ডের পরিবার সম্পর্কে জানতে পারলে একটু ভালো লাগবে। তার বাবা মাইকেল পেডারসন কীর্কেগার্ড সাহেবের সেই অপরাধবোধ কিংবা নিঃসঙ্গতা, তার ভাইবোনদের মৃত্যু ইত্যাদি জানাটা দরকার মনে হচ্ছে।”

বিড়াল বলল, “মাইকেল পেডারসন কীর্কেগার্ড অর্থাৎ সোরেন কীর্কেগার্ডের বাবা জন্মেছিলেন খুব গরীব পরিবারে। বারো বছর বয়সে তিনি কোপেনহেগেনে আসেন তার এক আত্মীয়ের ব্যবসায় কাজ করতে। নিজের চেষ্টা এবং পরিশ্রমে ২৪ বছর বয়সে নিজস্ব ব্যবসার মালিক হন এবং কোপেনহেগেনের অন্যতম একজন বিত্তবান ব্যক্তিতে পরিণত হন। ৩৮ বছরে বিয়ে করেন তার ব্যবসায়িক পার্টনারের বোনকে। কিন্তু সে স্ত্রী নিঃসন্তান অবস্থায় দুই বছরের মধ্যেই নিউমোনিয়ায় মারা যান। এর ১১ মাস পরে পেডারসন ব্যবসা থেকে অবসর নেন এবং প্রথম স্ত্রী মারা যাবার ১৩ মাস পরে তিনি সোরেন কীর্কেগার্ডের মা এনি সোরেন্সড্যাটার লুন্ড (Ane Sørensdatter Lund)   কে বিয়ে করেন। ইনি তার বাড়িতে কাজ করতেন। তাদের প্রথম সন্তানের জন্ম হয় বিয়ের পাঁচ মাস পরে। বিয়ের আগে থেকেই এনি লুন্ডের সাথে তার শারিরিক সম্পর্ক ছিল। পাঁচ মাসে সন্তান জন্ম স্বভাবতই তখনকার সময়েও লজ্জাজনক বিষয় ছিল। পেডারসনের মনে অপরাধবোধের শুরু হয়। তিনি মনে করতে থাকেন ঈশ্বর তাকে শাস্তি দিবেন এবং তার পাপের জন্য তার সব সন্তানেরা ৩৪ বছর বয়সের আগে মারা যাবে। তার এই ধারণা সম্ভবত ওল্ড টেস্টামেন্টের বুক অব জব এর কাহিনী থেকে অনুপ্রাণিত। পেডারসন ধর্মের প্রতি আরো অনুরক্ত হন। নিজের অপরাধবোধের জন্য এক ধরনের অসহায়তা এবং শূন্যতার বোধ তার মধ্যে প্রবলভাবে চলে আসে। যখন সোরেন কীর্কেগার্ডের জন্ম হয় তখন তার বাবার বয়স ছিল ৫৬ বছর। তার বাবা বৃদ্ধকালে পাওয়া এই সন্তানকে খ্রিস্টধর্মের কঠোর শাসনের মধ্যে রেখেছিলেন।

কীর্কেগার্ড বলেছিলেন, “আমার সব কিছুর জন্য আমি আমার পিতার কাছে ঋণী। যতভাবে সম্ভব তার সবভাবেই তিনি আমাকে অসুখী করে রেখেছিলেন, আমার যুবক বয়সকে করেছিলেন অসাধারন যন্ত্রণাময় এবং খ্রিস্ট ধর্মের বেড়াজালে আবদ্ধ করে রেখেছিলেন।”

অন্য পিতাদের মত সন্তানের প্রতি তার স্নেহের কমতি ছিল না। কীর্কেগার্ড বলেছিলেন, “ভালোবাসার কমতি তার ছিলো না, তিনি শুধু একটি শিশুকে বৃদ্ধ ভেবে ভুল করেছিলেন।” খ্রিস্ট ধর্ম দিয়ে শিশু বয়সে এমনভাবে কীর্কেগার্ডকে ঘিরে রেখেছিলেন তার বাবা যে পরে কীর্কেগার্ড বলেছেন, “তখন কখনো তার কাছে খ্রিস্ট ধর্মকে মনে হত সবচেয়ে অমানবিক নিষ্ঠুরতা।”

অন্য শিশুদের মত কাপড় চোপড় পরারও স্বাধীনতা ছিল না তার।

তবে বাবার এই শাসনের ব্যাপারটা পরবর্তী জীবনে সোরেন কীর্কেগার্ডকে সাহায্য করেছে। তার বেশিরভাগ কাজই খ্রিস্ট ধর্মকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে।

সোরেন কীর্কেগার্ডের একুশ বছর বয়সের মধ্যে তার পাঁচ ভাইবোন ও মা মারা যান আগেই বলেছি। তবে সেটা যতটা না ঈশ্বরের শাস্তি তার চেয়ে বেশি তখনকার অনুন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার কারণেই বলে আমার মনে হয়। সোরেন কীর্কেগার্ড ছিলেন সাত ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট। শুধুমাত্র তিনি এবং তার বড় ভাই পিটার ক্রিস্টিয়ান কীর্কেগার্ড বেঁচে ছিলেন। তাই ৩৪ বছরের মধ্যে মরে যাবেন এই বিশ্বাস কীর্কেগার্ডের মধ্যেও চলে এসেছিল।

এছাড়া তার বাবার সেই অপরাধবোধ, সেই নিঃসঙ্গতা কিংবা শূন্যতার বোধ সোরেন কীর্কেগার্ডের মধ্যেও চলে এসেছিল। তার বাবাকে নিয়ে ১৮৪৬ সালে একটা পত্রিকা লিখেছিলঃ

“An old man, who himself suffered exceedingly from melancholy, has a son in his old age, who inherits all this melancholy.”